অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় ফলের বাগান, গরুর খামার, ফুড প্যাকেজিং কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্বল্প খরচে উচ্চ বেতনে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দেশে একাধিক চক্র ভয়ংকর প্রতারণা করে আসছে। তাদের জাল ভিসার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ লাখ লাখ টাকা খোয়াচ্ছেন। প্রতারকচক্র জাল ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা অ্যাপ্রুভাল লেটার, ভুয়া ভিসা ভেরিফিকেশন ওয়েবসাইট ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের একটি টিম এ ধরনের প্রতারণায় যুক্ত প্রতারকচক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর ভয়ংকর প্রতারণার তথ্য পেয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশলে দেশের বিভিন্ন জেলার বিদেশে চাকরিপ্রত্যাশীদের টার্গেট করে প্রতারণা করে আসছিল। প্রতারকচক্রটি নিজেরাই জাল ভিসা ও জাল ডকুমেন্ট দিয়ে অস্ট্রেলিয়া গমনেচ্ছুদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই প্রতারণার কাজ নিখুঁতভাবে সারতে চক্রটি ইন্টারনেটে অস্ট্রেলিয়া সরকারের আদলে ‘অফিশিয়াল অস্ট্রেলিয়া ভিসা চেক ডটকম’ নামে ওয়েবসাইট খুলে প্রতারণা করে আসছিল। তারা নিজেরাই অস্ট্রেলিয়া গমনেচ্ছুদের জাল ভিসা তৈরি করে সেই ভিসার কপি নিজেদের বানানো ওই ওয়েবসাইটে আপলোড করত। আবার অস্ট্রেলিয়া গমনেচ্ছুদের পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে ওই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করিয়ে ভেরিফাই করে দেখায় ভিসাটি অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন থেকে অনুমোদন করা হয়েছে। ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা খোয়ানোর একটা পর্যায়ে ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারেন প্রতারকচক্রের পাল্লায় পড়েছেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তারা এই ভিসা
জালিয়াতচক্রের হদিস করতে গিয়ে দেখতে পান অধিকাংশ প্রতারকচক্রের ফোনের সর্বশেষ অবস্থান নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ থানার নয়নখাল ডাঙার হাট এবং পাশর্^বর্তী সৈয়দপুর থানার খাতা মধুপুর গ্রাম। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে এই দুই গ্রামে অভিযান চালিয়ে প্রতারক মারিফুল ইসলাম এবং বাচ্চা বাউ ওরফে হাসিনুরকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের হেফাজত থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ১টি ল্যাপটপ, ৭টি মোবাইল ফোন, ১৩টি সিম কার্ড এবং ৯টি বাংলাদেশি ভুয়া পাসপোর্ট উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা বিদেশে চাকরি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে মেডিক্যাল ফি, ভিসা প্রসেসিং ফি, ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন, টিকিট ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের কথা বলে ধাপে ধাপে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত।
জব্দকৃত ডিজিটাল ডিভাইসের প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত, বিভিন্ন ভুক্তভোগীর তথ্য, মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের আলামত এবং ভুয়া ভিসাসংক্রান্ত নথি পাওয়া যায়। চক্রটি এ পর্যন্ত ৭২ জনেরও বেশি ভুক্তভোগীর সঙ্গে একই ধরনের প্রতারণা করেছে।
এই গ্রেপ্তার অভিযানে নেতৃত্ব দেন গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের এডিসি মো. ওয়ালিউল ইসলাম। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ওই দুই আসামিকে ধরতে গিয়ে তারা দেখতে পান গভীর রাতেও ওই দুই গ্রামের ঘরে ঘরে আলো জ¦লছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন ওই দুই গ্রামের ঘরে ঘরে এই ভিসা জালিয়াতচক্রের বসবাস। তারা গভীর রাত পর্যন্ত প্রতারণার কাজে ব্যস্ত থাকেন। যে কারণে গ্রাম দুটি গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। ওই দুই গ্রামের যেসব তরুণ ফ্রিল্যান্সের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তাদের এখন মূল পেশা হয়ে উঠেছে ভিসা জালিয়াতি করে অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা করা।
গ্রেপ্তারের পর মারিফুল ইসলাম এবং বাচ্চা বউ ওরফে হাসিনুরও পুলিশের কাছে বলেছেন, গত দুই বছর ধরে এই দুই গ্রামের তরুণদের পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিসা প্রতারণা ও অনলাইন জুয়ার কারবার। ব্যাঙের ছাতার মতো গ্রাম দুটিতে এই অপকর্ম ছড়িয়ে পড়েছে। যে কারণে গ্রাম দুটির ঘরে ঘরে রাতে আলো জ¦লে।
জানা গেছে, প্রতারকচক্র অস্ট্রেলিয়ার ফলের বাগান, গরুর খামার এবং ফুড প্যাকেজিং কারখানায় স্বল্প খরচে ওয়ার্ক পারমিটে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেয়। এতে ইমু নম্বর এবং অস্ট্রেলিয়ার ফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়। এরপর ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে একটি দেশীয় হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করা হয়। একপর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ায় ওয়ার্ক পারমিটে চাকরিপ্রত্যাশী কারও সঙ্গে ৬ লাখ, কারও সঙ্গে সাত লাখ, আবার কারও সঙ্গে ৫ লাখ টাকার মৌখিক চুক্তি করে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাতে। চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানিতে কারও মাসিক ৩ লাখ, কারও বেতন ৪ লাখ টাকা বেতন হবে বলে জানায় প্রতারকচক্র। এরপর আবেদন ফি বাবদ ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা, মেডিক্যাল বাবদ ১৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা, ফিঙ্গার প্রিন্ট বাবদ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বিকাশে গ্রহণ করে প্রতারকচক্র। এরপর সংশ্লিষ্ট চাকরি প্রত্যাশীর জাল ভিসা তৈরি করে ‘অফিশিয়াল অস্ট্রেলিয়া ভিসা চেক ডটকম’ নামে ওয়েবসাইট আপলোড দেয় আবেদনকারীর কাছে আস্থা অর্জন এবং চুক্তি অনুযায়ী বাকি টাকা হাতিয়ে নিতে। পরে প্রতারকচক্রের কথামতো পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে প্রতারকদের ওয়েবসাইটে ঢুকে ভিসা ডাউনলোড করতে বলে। প্রতারকচক্র তাদের বলেন অস্ট্রেলিয়া হাইকমিশন ভিসা অ্যাপ্রুভ (অনুমোদন) করার পরই ওয়েবসাইটে আপলোড দিয়েছে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা জানেন না প্রতারকরা নিজেরাই ‘অফিশিয়াল অস্ট্রেলিয়া ভিসা চেক ডটকম’ নামে ওয়েবসাইট খুলে নিজেরাই জাল ভিসায় অ্যাপ্রুভ দেখিয়েছে। এরপর জাল ভিসার কপি দেখে চুক্তি অনুযায়ী টাকা দিলেই পুরো টাকায় চলে যায় প্রতারকদের পকেটে। এই জাল ভিসা নিয়ে অনেকেই টাকা পয়সা খোয়ানোর পাশাপাশি হয়রানিরও শিকার হয়েছেন।
আমাদের সময়ের কাছে একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, প্রতারকচক্র পুরান পল্টনের ‘ইত্তেহাদ মেডিক্যাল সেন্টার লিমিটেড’ নামে একটি মেডিক্যাল সেন্টারে পাঠায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য। মেডিক্যাল সেন্টারটি স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফি হিসেবে একেক জনের কাছ থেকে একেক রকম ফি নিয়ে থাকে। কিন্তু কখনও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফি গ্রহণের রসিদ দেয় না। প্রতিষ্ঠানটির এই পরীক্ষার জন্য সরকারের অনুমোদন রয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
জানতে চাইলে ‘ইত্তেহাদ মেডিক্যাল সেন্টার লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশ গমনেচ্ছুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সরকারি অনুমোদন পেতে তারা আবেদন করেছেন। তার ভাষ্য, বিভিন্ন রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান তাদের কাছে বিদেশগামীদের মেডিক্যাল করার জন্য পাঠায়। তারা মেডিক্যাল পরীক্ষা করে মানি রসিদ সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে থাকেন।
চাকরি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় যেতে প্রতারকচক্রকে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন শেরপুরের ব্যবসায়ী সায়েদুল হক। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, প্রতারকচক্রের কথায় বিশ^াস করে বিভিন্ন সময়ে বিকাশের মাধ্যমে আবেদন ফি মেডিক্যাল ফি, ভিসা প্রসেসিং ফি, ডকুমেন্ট চার্জসহ বিভিন্ন খাতে ধাপে ধাপে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা প্রদান করেন। সব প্রক্রিয়া শেষ করে গুলশানে ভিএফএস গ্লোবাল সেন্টারে গিয়ে তিনি পাসপোর্ট জমা দেন। দুই মাস পর তার পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয় সেখান থেকে। এরপর তিনি বুঝতে পারেন প্রতারিত হয়েছেন। তিনি বলেন, তার মতো আরও ৫/৬ জন প্রতারিত হয়েছেন। ছায়েদুল হক প্রতারণার ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি মামলা করেছেন। ওই মামলাতেই দুজনকে নীলফামারী থেকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
চাঁদপুরের বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিন আল মামুন আমাদের সময়কে বলেন, তার ভাই ও ভাইয়ের বন্ধু প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে আড়াই লাখ টাকা খুইয়েছেন। তিনি বলেন, মেডিক্যাল করতে তার ভাইয়ের কাছ থেকে পুরান পল্টনের ইত্তেহাদ মেডিক্যাল সেন্টার লিমিটেড ২৬ হাজার টাকা এবং ভাইয়ের বন্ধুর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা নেয়। কিন্তু কোন মানি রিসিট দেয়নি। তিনি বলেন, প্রতারকদের দেওয়া ফিঙ্গার প্রিন্টের কাগজে লেখা ছিল ২৮শ টাকা। কিন্তু গুলশানে ভিএফএস গ্লোবাল সেন্টারে তাদের কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে তারা অনেক দরকষাকষির পর ২৮শ টাকায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা হয়নি। পরে বুঝতে পারেন প্রতারিত হয়েছেন।





