বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ঢাকার অনুরোধ ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে ভারত সরকার স্পষ্ট করেছে, মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া হলেও ভারতের মাটি ব্যবহার করে তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন না।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার কমিটির নবম প্রতিবেদন লোকসভায় উপস্থাপন করা হয়। কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশী থারুরের সভাপতিত্বে প্রস্তুত ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’
শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভিসা, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে সরকারের অবস্থান ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর যে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে, তা ভারতীয় আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করছে। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর তাকে ফেরত পাঠানোর আবেদনের অগ্রগতি সম্পর্কে সংসদীয় কমিটি সরকারের কাছে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাখ্যা দেয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে আরও জানিয়েছে, বিষয়টি এখনও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এর মধ্যেই শুক্রবার প্রকাশিত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, তিনি ভারতে অবস্থান করলেও সেখান থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন না। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয় শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে বিদ্যমান মামলাগুলোর আলোকে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
মানবিক আশ্রয়, তবে রাজনৈতিক কার্যক্রম নয় : শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গুরুতর বিপদ বা প্রাণসংকটে থাকা ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার হাজার বছরের মানবিক ঐতিহ্য ভারতের রয়েছে। সেই নীতির ভিত্তিতেই শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে কমিটি জোর দিয়ে বলেছে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে একটি কঠোর নীতি অনুসরণ করে আসছে। সেটি হলোÑ ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হবে।
কমিটি সুপারিশ করেছে, ভারত সরকারের উচিত মানবিক অবস্থান বজায় রাখার পাশাপাশি পুরো বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে পরিচালনা করা, যাতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
ভিসা স্বাভাবিক করার তাগিদ : সংসদীয় কমিটি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ভিসাপ্রক্রিয়া দ্রুত স্বাভাবিক করার ওপরও জোর দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ভিসা সীমিত থাকায় দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পর্যটন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় দুই বছর ভারতীয় পর্যটন ভিসা কার্যত বন্ধ ছিল। পরে চলতি বছরের ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য আবারও ভিসা দেওয়া শুরু করে ভারত।
গঙ্গা চুক্তি নিয়ে দ্রুত আলোচনার আহ্বান : প্রতিবেদনে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ বছর চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ করে সংসদীয় কমিটি দ্রুত নতুন করে আলোচনা শুরু করার সুপারিশ করেছে। কমিটির মতে, নতুন চুক্তি প্রণয়নের সময় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীর পানিপ্রবাহের পরিবর্তন এবং সর্বশেষ পানিসম্পদ-সংক্রান্ত তথ্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্য সরকারকেও আলোচনায় সম্পৃক্ত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ইস্যুও গুরুত্ব পেয়েছে : প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার বিষয়টিকে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়টি নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় রাখার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
যে প্রেক্ষাপটে প্রত্যর্পণের আবেদন : ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। তার দেশত্যাগের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সে সময় থেকেই শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়। ওই সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে দৃশ্যমান অস্বস্তি তৈরি হয় এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে।
পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পরও শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি বহাল রাখা হয়। বর্তমান সরকারও একই বিষয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলছে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। অন্যদিকে ভারত শুরু থেকেই বিষয়টিকে আইনগত ও মানবিকÑ উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার কথা বলে আসছে।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা : বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় সংসদীয় কমিটির সর্বশেষ প্রতিবেদনটি শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আগামী দিনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সম্ভাব্য রূপরেখাও তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে একদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আবেদন আইন অনুযায়ী পর্যালোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, অন্যদিকে ভারতের মানবিক আশ্রয় নীতিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না।
পাশাপাশি ভিসাব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করা, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়নে আলোচনা শুরু, সীমান্ত-সহযোগিতা জোরদার এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সংসদীয় কমিটি দুই দেশের সম্পর্ককে বাস্তববাদী ও সহযোগিতামূলক ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি আগামী দিনেও ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে থাকবে। তবে একই সঙ্গে বাণিজ্য, পানি, যোগাযোগ, ভিসা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে দুই দেশকে সংলাপ ও সহযোগিতার পথেই এগোতে হবে। সংসদীয় কমিটির সর্বশেষ প্রতিবেদন সে বার্তাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।





