ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, দর্শন ও চেতনার আলোকে নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
‘নজরুলের চেতনায় নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রা’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেন্টার, ফ্রান্স শাখা।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, অন্যায়, শোষণ, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নজরুলের যে প্রতিবাদী চেতনা, তা বর্তমান সময়েও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেন্টার, ফ্রান্স শাখার উদ্যোগে সোমবার (১০ আগস্ট) বৃহত্তর প্যারিসের বুলোন-বিয়াঁকুর এলাকার একটি চার তারকা হোটেলের বলরুমে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
এতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এবং এর সঙ্গে নজরুলের সাহিত্য, দর্শন ও চেতনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।
সেমিনারের উদ্বোধন করেন ঢাকায় অবস্থানরত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লতিফুল ইসলাম শিবলী।
ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রেক্ষাপট এবং এর সঙ্গে নজরুলের চেতনার যোগসূত্র নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন।
চলতি বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের সংস্কৃতি ও চর্চার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানে নজরুলের সাহিত্য, দর্শন ও চেতনাকে নতুনভাবে সামনে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বারাকা গ্রুপের চেয়ারম্যান ফয়সল আহমদ চৌধুরী। প্রধান আলোচক ছিলেন আয়ারল্যান্ডপ্রবাসী কবি ও কলামিস্ট ডা. জিন্নুরাইন জায়গীরদার।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে ডা. জিন্নুরাইন জায়গীরদার বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার সংগ্রামে নজরুলের সাহিত্যকর্ম অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। জাতি হিসেবে বড় ঘটনাগুলো দ্রুত ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো স্মরণে রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সংগঠনের উপদেষ্টা ও নজরুল গবেষক খোরশেদ আলম পাটোয়ারী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহের কবি নন; তিনি প্রেম, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনারও কবি। তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি মানবমর্যাদা ও সাম্যের বার্তা রয়েছে, যা আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
প্রধান অতিথি ফয়সল আহমদ চৌধুরী বলেন, প্রবাসে নানা ব্যস্ততার মধ্যেও নজরুল ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে এ ধরনের আয়োজন প্রশংসনীয়। এসব আয়োজনের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে সংযোগ আরও দৃঢ় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেন্টার, ফ্রান্স শাখার সভাপতি ও কবি সোহেল আহমদ। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সেক্রেটারি নজমুল হক।
সভাপতির বক্তব্যে কবি সোহেল আহমদ বলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম শুধু আমাদের জাতীয় কবি নন, তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য বিদ্রোহী চেতনার প্রতীক। তার লেখনীতে শোষণ, অন্যায়, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।’
তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে নজরুলের সাহিত্য বাঙালি সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নজরুলচর্চা এবং তার অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী দর্শন আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজন রয়েছে।
সেমিনারে বাংলাদেশ কমিউনিটি ফ্রান্সের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী অঙ্গনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজনীতিবিদ রেজাউল করিম, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ফ্রান্স ২৪-এর অভিবাসনবিষয়ক সাংবাদিক ও ফ্রান্স বাংলাদেশ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এফবিজেএ) মুখপাত্র মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও তরুণ চিন্তক অ্যাডভোকেট মনোয়ার পাটোয়ারী, সাংবাদিক মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, দৈনিক কালের কণ্ঠের ফ্রান্স প্রতিনিধি ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব তানভীর আহমদ তোহা, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল কমিউনিটির সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি সাংবাদিক সরদার হাসান ইলিয়াছ তানিম, দ্য ডেইলি সান ও বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরের ফ্রান্স প্রতিনিধি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সহসভাপতি মুমিন আনসারী।
এ ছাড়া রফিকুল হক রাসেল, আবদুল হাকিম, হেলাল আহমেদ, ফয়সাল আহমেদ ও সাঈদ ইরফানসহ বাংলাদেশ কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকরা বলেন, প্রবাসে নজরুলের সাহিত্য, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক দর্শনের চর্চা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিদের দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করাও এ ধরনের আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।





