শিক্ষাপাগল মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। পড়ালেখা বেশিদূর করতে পারেননি অর্থাভাবে। সংসারে সচ্ছলতা আনতে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিদেশে। সেখানে ভাড়ায় গাড়ি চালিয়ে দেশে গড়েছেন ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। হাসপাতাল করার জন্য কিনেছেন জমি। ৬৪ বছর বয়সে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে পড়ছেন তিনি।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের স্কুলশিক্ষক আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরীর ছেলে। এসএসসির আগেই বাবাকে হারান। কোনোমতে পাস করেন এইচএসসি। অর্থাভাবে এর বেশি পড়তে পারেননি। সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে পাড়ি জমান কাতারে। পড়িয়েছেন ভাইবোনদের।
টাকার অভাবে গরিব ছেলেমেয়েরা যাতে শিক্ষাবঞ্চিত না হয়, সেজন্য নিজের নামে ফাউন্ডেশন গড়ে ২০০ শিক্ষার্থীকে দিয়েছেন বৃত্তি, ঘর করে দিয়েছেন ১০ গৃহহীন পরিবারকে।
কাতারে গাড়ি চালিয়ে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় ১৯৮৯ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে নির্মাণশ্রমিক, রেস্তোরাঁর কাজ শেষে ১৯৯২ সালে ট্যাক্সি চালানোর লাইসেন্স পান। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ট্যাক্সি চালাচ্ছেন তিনি। উপার্জিত টাকায় ব্রাহ্মণপাড়ায় ডায়াবেটিক হাসপাতালের জন্য ২ কোটি টাকা মূল্যের জমি কিনেছেন, গড়েছেন ছয়টি স্কুল-কলেজ, দুটি পাঠাগার।
তিনি মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী কলেজ, আব্দুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ, আশেদা জোবেদা খান চৌধুরী ফোরকানিয়া মাদরাসা, মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী হাফেজিয়া মাদরাসা, মুমু রোহান কিন্ডারগার্টেন গড়ে তুলেছেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠা করেছেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী লাইব্রেরি ও ডা. মিজানুর রহমান চৌধুরী কিশোরী পাঠাগার।
তার নামের কলেজে এখন চারতলা ভবন। শিক্ষার্থী প্রায় পাঁচ হাজার। এইচএসসির ফলাফলের দিক থেকে কুমিল্লা বোর্ডের সেরা ১০ কলেজের একটি এটি। গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিশেষ ছাড়। লক্ষ্য একটাই, অর্থের অভাবে যেন কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থেমে না যায়।
মোশাররফ হোসেন বললেন, ‘পড়ালেখার মূল্য আমি বুঝি। টাকার অভাবে এলাকার কারও পড়া যেন বন্ধ না হয়, সেজন্য এত কিছু করা। মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে মনটা প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। ব্রাহ্মণপাড়ার প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চাই।’
‘আমি এ বয়সে এসেও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে পড়ছি। পড়াশোনার কোনো বয়স নেই’— যোগ করেন তিনি।
প্রবাসে মেসে থাকেন দুই সন্তানের জনক মোশাররফ। স্ত্রী-সন্তানরা থাকেন দেশে। কখনো যুক্তরাষ্ট্রে নেননি তাদের। কারণ হিসেবে বললেন, ‘মেসে আমি যেনতেনভাবে থাকতে পারি। আলুভর্তা, ডাল বা ডিম দিয়ে চলে যায় তিনবেলা। পরিবার নিয়ে গেলে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হতো। তাতে খরচ বাড়ত। বরং সেই টাকা দেশের মানুষের কাজে লাগাতে চেয়েছি।’





















