যাত্রীকে ধর্ষণের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্য গোপন করায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব খোয়ালেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান ট্যাক্সি চালক গুরমিত সিং। ৫৫ বছর বয়সী গুরমিত সিং বর্তমানে নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। ২০১১ সালে এক নারী যাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনায় ২০১৪ সালে তার ২০ বছরের কারাদণ্ড হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নিউ ইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালত ২৬ অগাস্ট গুরমিত সিংয়ের ন্যাচারালাইজেশন বা নাগরিকত্ব গ্রহণের আদেশ বাতিলের রায় দেয়। বিচার বিভাগ বলছে, ২০১১ সালের মে মাসে ওই অপরাধ করার কয়েক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের আবেদন করেন গুরমিত সিং। কিন্তু নাগরিকত্ব পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি ওই অপরাধের তথ্য গোপন করেন। ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে শপথ নেন। এরপর ২০১৪ সালে নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে তিনি অপহরণ ও ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতের নথি ও বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২০১১ সালের ৬ মে।
গুরমিত সিং তখন ট্যাক্সিক্যাব চালাতেন। তিনি নিউ ইয়র্কের উইলিয়ামসবার্গ এলাকা থেকে ২৬ বছর বয়সী এক নারীকে গাড়িতে তোলেন। ওই নারী যাত্রাপথে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এক পর্যায়ে গুরমিত সিং তাকে গন্তব্যে না নিয়ে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে ওই নারী ঘুম থেকে উঠে দেখেন, চালক তার ওপর উঠে আছেন এবং তার গলায় ছুরি ঠেকিয়ে রেখেছেন। মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গুরমিত সিং ওই নারীকে ভয় দেখিয়ে হাত-পা ও মুখ বেঁধে ফেলেন, চোখ বেঁধে দেন এবং তার পোশাক খুলে ধর্ষণ করেন। পরে ওই নারী গাড়ি থেকে পালিয়ে ভোরের দিকে রাস্তায় একজনের কাছে গিয়ে সাহায্য চান। পুলিশের তদন্তে পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে গুরমিত সিংয়ের সঙ্গে ওই ঘটনার যোগসূত্র পাওয়া যায়। ২০১৪ সালের মে মাসে জুরি তাকে ধর্ষণ ও অপহরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। নিউ ইয়র্কের আপিল আদালতও ২০১৭ সালে তার দণ্ড বহাল রাখে।
মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গুরমিত সিং ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছয় মাসের ভ্রমণ ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদনহীনভাবে অবস্থান করেন। পরে পরিবারের মাধ্যমে করা অভিবাসন আবেদনের ভিত্তিতে ২০০০ সালের জুনে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পান। এরপর ২০১১ সালের মে মাসে নারী যাত্রীকে ধর্ষণ ও অপহরণের ঘটনা ঘটানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি মার্কিন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন। ওই অপরাধের তথ্য গোপন করেই তিনি নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া শেষ করেন এবং ১৯ অক্টোবর নাগরিক হিসেবে শপথ নেন। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া এবং ন্যাচারালাইজেশনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার মধ্যে আইনি পার্থক্য রয়েছে। ন্যাচারালাইজেশনের মাধ্যমে পাওয়া নাগরিকত্ব নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফেডারেল আদালতের আদেশে বাতিল করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ফেব্রুয়ারিতে গুরমিত সিংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করার সময় জানিয়েছিল, কোনো ব্যক্তি যদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিয়ে নাগরিকত্ব অর্জন করেন, তাহলে আইন অনুযায়ী তার ন্যাচারালাইজেশন বাতিল করা যেতে পারে।
গুরমিত সিংয়ের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের অভিযোগ ছিল, নাগরিকত্বের আবেদনের সময় তিনি তার বিরুদ্ধে থাকা ধর্ষণ ও অপহরণের তথ্য গোপন করেছিলেন। ২ ফেব্রুয়ারি বিচার বিভাগ তার নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য মামলা করে। ২৬ অগাস্ট বিচারক নিকোলাস গ্যারোফিস নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশ দেন। বিচার বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, “আমেরিকার নাগরিকত্ব অপরাধীদের সুরক্ষা দেবে না।” আদালতের আদেশ অনুযায়ী, গুরমিত সিংকে তার ন্যাচারালাইজেশন সনদ ও মার্কিন পাসপোর্টসহ নাগরিকত্বের নথি ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা দিতে হবে। তিনি বর্তমানে নিউ ইয়র্কের শাওয়ানগাঙ্ক কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে ২০ বছরের সাজা ভোগ করছেন। তার সাজা শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৯ সালের ফেব্রুয়ারি। এরপর তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার থাকবে দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের হাতে। সূত্র : রয়টার্স।





