ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ১ হাজার ৬৬৮ জন অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একই সময়ে নিহত বা নিখোঁজের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৫ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মতে, ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রা, সমুদ্রে দুর্বল উদ্ধার তৎপরতা এবং ইউরোপের বহির্সীমায় অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ার ফলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুট
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, নিহত বা নিখোঁজদের মধ্যে ৮৭২ জন সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে ইউরোপে যাওয়ার সময় প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।
এই রুটের অন্যতম প্রধান পথ হলো উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো—বিশেষ করে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের দিকে যাত্রা। বিপজ্জনক এই সমুদ্রপথে অভিবাসীরা সাধারণত অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও অনিরাপদ নৌযানে যাত্রা করেন।
ইউরোপে প্রবেশের উদ্দেশ্যে অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট ও যাত্রার দেশ হিসেবে লিবিয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
৯ আগস্ট প্রকাশিত এনজিও Alarm Phone-এর অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে ভূমধ্যসাগরীয় অভিবাসন পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
এই রুটে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি
সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে যাত্রা করা অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে এনজিও SOS Méditerranée।
সংস্থাটির ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, এই রুটে যাত্রা করা অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের অংশ ছিল ২৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে—
- ইরিত্রিয়া — ১৬ শতাংশ
- সুদান — ১৩ শতাংশ
- পাকিস্তান — ১২ শতাংশ
- মিসর — ৯ শতাংশ
এ ছাড়া ২০১৬ সাল থেকে নাইজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, গিনি ও মালিসহ পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এই রুট ব্যবহার করে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশিদের এত বড় অংশগ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি অংশ প্রথমে মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গিয়ে পরে দালালচক্রের মাধ্যমে লিবিয়ায় পৌঁছান। সেখান থেকে শুরু হয় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা।
ইউরোপে পৌঁছাচ্ছেন কম, কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে লিবিয়া ও তিউনিসিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছেছেন ২৬ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ।
আগের কয়েক বছরের তুলনায় ইউরোপে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু একই সময়ে নিহত বা নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অভিবাসনপথের ঝুঁকি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ সমুদ্রপথে যাত্রা করা মানুষের সংখ্যা কমলেও নিরাপদে ইউরোপে পৌঁছানোর সম্ভাবনা অনুপাতে বাড়েনি। বরং বিপজ্জনক যাত্রার কারণে প্রাণহানির ঝুঁকি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
ইউরোপের কঠোর সীমান্তনীতির প্রভাব
সমুদ্রপথে অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ আরনো বানস এপ্রিলের শুরুতে InfoMigrants-কে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহির্সীমায় অভিবাসীদের যাত্রা ঠেকানোর প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।
তার মতে, একদিকে ইউরোপের উপকূলে পৌঁছাতে পারছেন কমসংখ্যক অভিবাসী, অন্যদিকে সমুদ্রপথে যাত্রা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ফলে ইউরোপে পৌঁছানোর আগে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনিয়মিত অভিবাসনের পথগুলো আরও গোপন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে মানবপাচারকারী ও দালালচক্রের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে এবং অভিবাসীদের নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশিদের জন্য বাড়ছে উদ্বেগ
ভূমধ্যসাগরীয় পথে যাত্রাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ অংশ থাকার তথ্য দেশের অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও পরিবারগুলোর জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
উন্নত জীবন, কর্মসংস্থান ও ইউরোপে স্থায়ীভাবে বসবাসের আশায় অনেক বাংলাদেশি তরুণ দালালদের প্রলোভনে বিপজ্জনক অভিবাসনপথে পা রাখছেন। কিন্তু এই যাত্রার প্রতিটি ধাপেই রয়েছে প্রতারণা, নির্যাতন, আটক, মানবপাচার এবং প্রাণহানির ঝুঁকি।
ভূমধ্যসাগরে সাম্প্রতিক প্রাণহানির পরিসংখ্যান আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে—অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন অনেকের জন্য জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য অভিবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় ইউরোপমুখী এই প্রাণঘাতী সমুদ্রযাত্রায় মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।





