প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর ঘিরে যখন ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই সমীকরণে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরব। রিয়াদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য এসেছে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণ। এর আগে সৌদি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরও দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মাত্রা নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, রোহিঙ্গা সংকট, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং ভারতের সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ—এই কয়েকটি বিষয় একই সময়ে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির সামনে বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
দিল্লি সফর নিয়ে ঢাকার শর্ত কোথায়?
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসছে।
ঢাকার অবস্থান হচ্ছে, প্রত্যর্পণ ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সফরের পরিবেশ তৈরি করা কঠিন।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সম্প্রতি বলেছেন, শেখ হাসিনার বিষয়টি ভারতের বিচারিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
এই বক্তব্য কূটনৈতিক আলোচনায় নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ, এতদিন প্রত্যর্পণ ইস্যুটি মূলত দুই দেশের সরকারি ও কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবেই আলোচিত হয়ে এসেছে। এখন ভারত বিষয়টিকে তার নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—দিল্লি কি বিষয়টিকে কেবল আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে, নাকি এর সঙ্গে বৃহত্তর কূটনৈতিক বার্তাও রয়েছে?
সৌদি সমীকরণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এর মধ্যেই সৌদি আরবের আমন্ত্রণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ জাফের এইচ বিন আবিয়াহ প্রধানমন্ত্রীর কাছে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দিয়েছেন। এর আগে সৌদি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-খেরেজির ঢাকা সফরও দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র শ্রমবাজার। তবে একই সঙ্গে সৌদিতে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রদান ও পাসপোর্ট নবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন কূটনৈতিক জটিলতা।
বাংলাদেশের জন্য সৌদি শ্রমবাজার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রোহিঙ্গাদের পরিচয়, নাগরিকত্ব ও প্রত্যাবাসনের প্রশ্নও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের নতুন বার্তা
রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছর পূর্তির সময়ে মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে দেওয়া তালিকা যাচাই করে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে তাদের প্রত্যাবাসনের আগে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন বলেও জানিয়েছে মিয়ানমার।
ঘোষণাটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসন কবে এবং কীভাবে শুরু হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে মিয়ানমার, ভারত, সৌদি আরব ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
নিরাপত্তা ইস্যুতে নতুন উদ্বেগ
এর মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশে আল-কায়েদার উপস্থিতি বা সক্রিয়তার অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে মূল প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের গুরুতর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দাবির ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার আগে তার উৎস, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার আনুষ্ঠানিক অবস্থান যাচাই প্রয়োজন।
এদিকে ২০২৪ সালের আগস্টে কারাগার থেকে জঙ্গি পালানো এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় জামিনে মুক্তির ঘটনাকে ঘিরে নিরাপত্তা মহলে যে উদ্বেগ রয়েছে, সেটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বাড়লে এর প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কেও পড়তে পারে।
শাহজালালের মাজারের ডেগে শেখ হাসিনাকে নিয়ে চিঠি
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের একটি ডেগ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু, সুস্থতা ও দেশে ফেরার কামনা করে লেখা একটি চিঠি উদ্ধারের খবর সামনে এসেছে।
চিঠিতে শেখ হাসিনাকে ‘মৃত্যুর মুখ’ থেকে রক্ষা এবং তার আয়ু বাড়ানোর জন্য প্রার্থনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা দাবি করে সেগুলো থেকে তাদের রক্ষার আবেদন জানানো হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনুলিপিতে দেখা গেছে।
চিঠিতে লেখক হিসেবে ‘সজিব’ নামের একজনের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তবে চিঠিটির সত্যতা, লেখকের পরিচয় এবং এর পেছনে কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মাজারে মানত, দোয়া কিংবা ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা লিখে রাখার ঘটনা নতুন নয়। তাই ঘটনাটিকে রাজনৈতিক অর্থে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন।
ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা ঘিরে নতুন হিসাব
শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন—এমন বক্তব্য সামনে আসার পর থেকেই বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সম্পর্কের প্রশ্ন।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে এই তিনটি ইস্যুর ওপর।
দিল্লি সফর আপাতত বাতিল
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৬ আগস্ট জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর আপাতত বাতিল হয়েছে।
এর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে সফরটি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হচ্ছিল। সফরটি স্থগিত হওয়ায় এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—ঢাকা-দিল্লির আলোচনায় কোন কোন বিষয়ে সমঝোতা হয়নি?
অন্যদিকে পাকিস্তানের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে উষ্ণতা, ভারতের সঙ্গে দূরত্ব?
পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি জরিপে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য উঠে এসেছে। জরিপে পাকিস্তানের ৬৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতা বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। ভারতের ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাবের হার ছিল ২৫ শতাংশ।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই জরিপটি পরিচালিত হয়েছিল ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি দিয়ে সেই জরিপের ফল সরাসরি ব্যাখ্যা করা যাবে না।
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে। একই সময়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সামনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরীক্ষা
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে এখন একাধিক সমীকরণ।
একদিকে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর। অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে শ্রমবাজার ও রোহিঙ্গা ইস্যু। এর পাশাপাশি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাড়তে থাকা যোগাযোগ।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত-পাকিস্তান প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ঢাকার জন্য চ্যালেঞ্জ একটাই: কোনো পক্ষের কূটনৈতিক বলয়ে আটকে না গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিয়ানমার এবং পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
কারণ, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কূটনীতিতে প্রতিটি সফর, প্রতিটি প্রত্যর্পণ ইস্যু এবং প্রতিটি আন্তর্জাতিক বক্তব্যের পেছনে রয়েছে বৃহত্তর আঞ্চলিক সমীকরণ।
ফের সেই পুরোনো প্রশ্নই সামনে—ভারত-পাকিস্তান প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন পর্বে বাংলাদেশ নিজের কূটনৈতিক অবস্থান কতটা স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করতে পারবে?





