পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে ৬০টি দেশের ‘যথেষ্ঠ পদক্ষেপ’ নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তদন্তে নামায় এককভাবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রপ্তানির গন্তব্যের দেশটিতে কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না সেই ভাবনা সামনে এসেছে।
আপাত দৃষ্টিতে এটিকে শুধু নীতি ও পদক্ষেপ যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ তদন্তের ফল নেতিবাচক হলে তা ভবিষ্যতে রপ্তানি খাতে চাপ তৈরিতে কতটা প্রভাব ফেলবে সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মধ্যে।
নিজেদের ক্রেতা ও শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় তখন যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার শঙ্কা থাকছে। এরপরও এ তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের নেতারা।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটি সব ধরনের ‘কমপ্লায়েন্স’ মেনে চলায় তারা একক দেশ হিসেবে বৃহত্তম রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রের এ তদন্তকে ‘ভয়ের কারণ’ দেখছেন না।
একইরকম ভাষ্য মিলেছে সরকারের তরফেও। রপ্তানি বাজারে এর কোনো ‘প্রভাব থাকবে না’ বলে মনে করছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান।
যে আইনের অধীনে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর- ইউএসটিআর তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছে সেই আইন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে কোনো দেশের নীতি বা বাণিজ্য আচরণ তাদের ব্যবসার জন্য ‘অযৌক্তিক’ বা ‘বৈষম্যমূলক’ তাহলে ‘প্রতিক্রিয়ামূলক বাণিজ্য ব্যবস্থার’ মত পদক্ষেপ নিতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে- শুল্ক আরোপ বা আমদানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া; ওই দেশের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তির আওতায় রপ্তানিতে ছাড় দেওয়া হলে তা তুলে দেওয়া বা প্রত্যাহার করা; অথবা দেশটির সরকারের সঙ্গে ‘বাধ্যতামূলক’ চুক্তি করে ‘বিতর্কিত’ কার্যক্রম বন্ধ করা বা যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।
অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশকেও এমন তদন্তের মধ্যে রাখার সিদ্ধান্তকে ‘মোস্ট স্ট্রেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার।
তিনি বলেন, ‘জোরপূর্বক শ্রম’ হিসেবে যে সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না।
তবে যুক্তরাষ্ট্র বড় বাজার হওয়ায় বাংলাদেশসহ সব দেশের জন্যই এ তদন্তকে ‘ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের’ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশকে কৌশলগত দেনদরবারের দিকে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক এই পরামর্শক।
কেন এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের
ইউএসটিআর বৃহস্পতিবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর–তা খতিয়ে দেখতে এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
এ তদন্ত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১(বি) ধারার আওতায়, যেটির মাধ্যমে অন্য দেশের বাণিজ্য নীতি মার্কিন বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক মনে হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য থাকার পরও দেশগুলোর সরকার তাদের বাজারে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সেগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
“এ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করব, বিদেশি সরকারগুলো জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে কি না এবং এসব অনৈতিক চর্চা মার্কিন শ্রমিক ও ব্যবসার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।”
ইউএসটিআর বলছে, তদন্ত শুরু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত দেশের সরকারগুলোর কাছে আলোচনার অনুরোধ পাঠানো হয়েছে।
এ তদন্তের শুনানি ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে বলে তুলে ধরেছে ইউএসটিআর।
শুনানিতে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মতামত দিতে চায় বা অংশ নিতে চায় বা সাক্ষ্যের সারসংক্ষেপ জমা দিতে চায়, তাদের ১৫ এপ্রিলের মধ্যে লিখিত মতামত ও আবেদন জমা দেওয়ার কথা বলেছে মার্কিন সংস্থটি।
তদন্ত মানেই কি নিষেধাজ্ঞা?
তদন্ত শুরু হওয়া মানেই তাৎক্ষণিক শুল্ক বা আমদানি নিষেধাজ্ঞা নয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্প্রসারণে একের পর এক যেসব সিদ্ধান্ত নিয়ে চলছে তাতে শঙ্কাও কম নয়।
সাধারণত এমন তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতি ও আইন মূল্যায়ন করা হয় এবং পরে প্রয়োজন হলে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মূলত মার্কিন বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষা ও তার সম্প্রসারণের একটা ব্যবস্থা হিসেবে এটি গ্রহণ করা হয়।
৩০১ ধারা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, আমদানি সীমাবদ্ধতা আরোপ বা বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আবার সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেও বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমবার এসে ২০১৭ সালে এ ধারার ব্যবহার শুরু করে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অরগানাইজেশন (ডব্লিউটিও) ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর অনেক বছর যুক্তরাষ্ট্র এ ধারা মূলত সংস্থাটিতে মামলা করার ভিত্তি তৈরির জন্য ব্যবহার করত।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেবার এ আইনের ব্যবহার বাড়ায়। প্রথমেই ২০১৭ সালে চীনের প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মেধাস্বত্ব নীতির তদন্ত চালু করে এবং পরের বছর দেশটির প্রায় ৩৭০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে ২৫ শুল্ক আরোপ করে।
এ সিদ্ধান্তকে ‘চ্যালেঞ্জ’ করে চীন ডব্লিউটিও এর দ্বারস্থ হয় এবং বলে- এটি সংস্থাটির বিধিবিধানের ‘সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’। পরে সংস্থাটি চীনের পক্ষে রুল জারি করলেও যুক্তরাষ্ট্র সেটি আমলে না নিয়ে শুল্ক আরোপ চালিয়ে যায়।
এরপর ২০২০ সালে বিমান শিল্পে ভর্তুকি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক বসানো হয়, যা পরে ২০২১ সালে স্থগিত করা হয়।
বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় এসেও পরে এ ধারা অব্যাহত রাখে। নতুন করে নিকারাগুয়ার শ্রম ও মানবাধিকার নীতি, চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প নীতি এবং চীনের জাহাজ নির্মাণ ও শিপিং খাত নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করে।
ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয় দফায় এসে ব্রাজিলের ডিজিটাল বাণিজ্য ও ইলেক্ট্রনিক পেমেন্ট সেবা, ইথানল মার্কেট এক্সেস এবং চীনের বিরুদ্ধে আরও একটি তদন্ত শুরু করে।
সবশেষ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ছাড়া অন্য যেসব দেশের ওপর তদন্ত হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বাহামা, বাহরাইন, ব্রাজিল, কম্বোডিয়া, কানাডা, চিলি, চীন, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ইকুয়েডর, মিসর, এল সালভাদর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), গুয়াতেমালা, গায়ানা, হন্ডুরাস, হংকং (চীন), ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, ইসরায়েল, জাপান, জর্ডান, কাজাখস্তান, কুয়েত, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, মরক্কো, নিউজিল্যান্ড, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, নরওয়ে, ওমান, পাকিস্তান, পেরু, ফিলিপাইন, কাতার, রাশিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, সুইজারল্যান্ড, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), যুক্তরাজ্য, উরুগুয়ে ও ভেনেজুয়েলা।
এর আগে গত বুধবার উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে দেশটি।
‘শঙ্কার কারণ নেই’
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের শিল্পে পণ্য উৎপাদনে দীর্ঘদিন থেকেই জোরপূর্বক শ্রম না থাকার দাবি করে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এ নিয়ে ‘শঙ্কার কোনো কারণ’ দেখছেন না।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন তার দেশের বাণিজ্য বাড়াতে একের পর এক যেসব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে এবং শুল্কের বোঝা চাপিয়ে দেশটির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য চুক্তি সেরে নিচ্ছে- তাতে কিছুটা হলেও ভয় দেখছেন তিনি।
এজন্য রপ্তানিকারকদের সঙ্গে বসে বর্তমান সরকারকে দ্রুত কৌশল ঠিক করার তাগিদ দিয়েছেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে। পরে দর কষাকষি করে এ হার ২০ শতাংশ নামে, যা ১ অগাস্ট কার্যকর হয়। আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যে ছিল ১৫ শতাংশ শুল্ক; সব মিলিয়ে শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।
বাড়তি এ শুল্ক কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার টানা নয় মাসের বেশি সময় ধরে আলোচনা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। সমঝোতায় পৌঁছাতে মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়ায় বাংলাদেশ। বোয়িং, গম, সয়াবিন, তেলসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়াতে দেয় প্রতিশ্রুতি।
এ নিয়ে দেন দরবারের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে আরোপিত পারস্পরিক সম্পূরক শুল্ক ১ শতাংশ পয়েন্ট কমে হয় ১৯ শতাংশ। তাতে করে মোট শুল্কহার আগের কমে হয় ৩৪ শতাংশ।
নতুন এ চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ছাড় দেবে; কিন্তু বিনিময়ে তাদের পণ্য আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজারে তাদের আরও বড় ছাড় দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হয় অন্তর্বর্তী সরকারকে।
কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে করা এ চুক্তি নিয়ে পরে সমালোচনা আসে বিভিন্ন মহল থেকে। বাংলাদেশ অন্য দেশ থেকে কী আমদানি করবে বা করবে না সেক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখার বাধ্যবাধকতার মতো বিষয়গুলোও ঠাঁই পাওয়ার সমালোচনা করেন তারা।
বিকেএমইএর সভাপতি হাতেম ওই দিকটায় ইঙ্গিত করে বলেন, “সরকারকে আহ্বান করব যে বিষয়টা নিয়ে স্টেকহোল্ডারদের সাথে বসে আলোচনা করে এটার কৌশল ঠিক করা দরকার।
“কোন পয়েন্টে কীভাবে কথা বলতে হবে, কী করতে হবে–এগুলো নিয়ে মনে হয় একটু প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হবে আমাদের। ২৮ এপ্রিল বোধহয় ডেট দিছে। তো তাহলে এর আগে একটা প্রস্তুতি নিতে হবে।”
তবে এখনই ‘কোনো শঙ্কার কারণ নেই’ মন্তব্য করে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, “আমাদেরকে কেন ফেলল (তদন্তে), সেটাও আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। তবে আমরা এটাকে স্বাগত জানাই।
“খুব ট্রান্সপারেন্ট ওয়েতেই আমরা বিজনেস করি। সুতরাং তারা আসুক, তদন্ত করতে চায় করুক, এতে কোনো আপত্তি নেই।”
বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করে সেখানে শিশু শ্রম বা জোরপূর্বক শ্রমের বিষয় আছে কি না কিংবা এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নে হাতেম বলেন, “না, আমরা কী আমদানি করি? আমরা র’ মেটেরিয়ালস (কাঁচামাল) আমদানি করি চীন থেকে। এখন চীনে শিশু শ্রম আছে? আমেরিকার বেশির ভাগ রপ্তানিই তো যায় চীন থেকে। তারা কি চীনের রপ্তানি বন্ধ করে দিছে?
“সুতরাং এটা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত না।”
‘সম্পর্কে কৌশলী হতে হবে’
যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে বাংলাদেশের নাম আসায় বিস্ময় প্রকাশ করে তাদের ‘ইনটেনশন’ আমলে নেওয়ার কথা বলেছেন বাণিজ্য বিশ্লেষক জায়েদী সাত্তার। বলেন, “এটা তো আমি যতটুকু পড়ে দেখলাম, এটা তো মোস্ট ‘স্ট্রেঞ্জ’। মানে তারা ফোর্সড লেবার যেভাবে বর্ণনা করেছে, এটা আমাদের এখানে তো অ্যাপ্লাই-ই করে না।“
তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন একের পর এক বাণিজ্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ডব্লিউটিওর বিধিবিধান মানছে না। আবার দেশটির বাজারে পণ্য রপ্তানির প্রবেশাধিকারও প্রয়োজন কেননা সেখানে চাহিদা বেশি, মূল্যও পাওয়া যায় বেশি।
এসব কারণ তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ‘স্ট্র্যাটেজিক এবং ট্যাক্টফুল রিলেশনশিপ মেনটেইন‘করার পরামর্শ তার।
দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পাশাপাশি এমন তদন্ত থেকে মুক্ত থাকতে আইএলও কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক যেসব শ্রম বিধি-বিধান আছে সেগুলো অনুসরণ করার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক এই পরামর্শক বলেন, “কারণ আমরা রপ্তানি করছি কিন্তু উন্নত দেশে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন একদিকে আছে, ইউরোপ আছে, অন্যদিকে নর্থ আমেরিকা আছে।
“সুতরাং আমাদেরকে আজকে না হোক কালকে আমাদেরকে ওদের শ্রম আইন এবং ওদের যে এমপ্লয়মেন্টের যে এনভায়রনমেন্ট থাকে, ওটার কাছাকাছি যেতে হবে।
“সব একেবারে নিখুঁত না হলেও অন্তত বোঝাতে হবে যে আমরা আন্তর্জাতিক শ্রম আইন-বিধি অনুসরণে আগ্রহী।”
জায়েদী সাত্তার বলেন, “মনে হচ্ছে যে শুধু বাংলাদেশের উপরে না। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা সবাই আছে এই ৬০ দেশের মধ্যে। এবং বিস্ময়করভাবে আছে নিউ জিল্যান্ড। সুইজারল্যান্ড আছে, যুক্তরাজ্য আছে। তো কাউকে তো বাদ দেয় না।
“সুতরাং মনে হচ্ছে এটা ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়। কারণ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য এখন ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কে রূপ নিয়েছে।”
সরকার কী ভাবছে?
যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত কোনো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে কি না এমন প্রশ্নে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের মনে হয় না। এটাতো প্রায় ৬০টা দেশের মধ্যে হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ব্রিটেন আছে।
“এখন বিষয়টা হলো যে আমাদের শিশু শ্রম অনানুষ্ঠানিক খাতে আছে। ধরেন দোকানদারি করে যে- সেটাতো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। আমাদের তৈরি পোশাক খাতে একসময় এটা ছিল, এখন এটা নাই। এটা হলো শ্রম বিষয় একটা।
“আর আরেকটা হলো যে অধিক সক্ষমতা (উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন)। আমাদের অধিক সক্ষমতা কোনো খাতেই নেই। তৈরি পোশাক খাতেতো নাই-ই, যেটা প্রধান খাত। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতির মুখে ফেলে এমন নাই।“
তবে সিমেন্ট খাতে অধিক সক্ষমতা থাকলেও তা প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোর মধ্যে তা না থাকায় এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই বলে তুলে ধরেন তিনি।
বাণিজ্য সচিব বলেন, “বাকি অন্যান্য বাণিজ্য সম্পর্কিত বা অশুল্ক বাধা সেগুলো আছে, তাতেও আমাদের তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে বলে আশা করি না।”
বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করে ওইসব দেশে পণ্য তৈরিতে জোরপূর্বক শ্রম রয়েছে কিনা এবং বাংলাদেশ তা খতিয়ে দেখে আমদানি করে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা যেগুলো আমদানি করি, সেগুলো মূলত কাঁচামাল এবং উচ্চ পর্যায়ের প্রযুক্তি। কাজেই এটা মনে হয় না।“
দেশের শ্রম আইনে শিশু শ্রমের বিষয়টিও যুক্ত করায় এ নিয়ে ভাবনা না থাকার কথাও বলছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকার কীভাবে সমঝোতা করবে তা নিয়ে প্রস্তুতি ও পদক্ষেপের প্রসঙ্গে মাহবুবুর রহমান বলেন, “প্রস্তুতির ওইরকম কিছু নেই। অনলাইনে সবকিছু-এগুলো আছে।
“আর বাকি হলো উপসচিব-যুগ্ম সচিব পর্যায়ের একটা গ্রুপ করে তেব। ওরা (ইউএসটিআর) যা জানতে চায় তাদের সঙ্গে কথা বলবে। আগের মতো ওই রকম… (বাড়তি সম্পূরক শুল্কের বিপরীতে দেনদরবারের মতো) দরকার হবে না, মনে হয়।”
তার ভাষ্য, “আগের মতো একদম ওই রকম প্রচুর সমঝোতা ও দেনদরবার করতে হবে- ওরকম মনে হচ্ছে না।”











