ফ্রান্সজুড়ে শুরু হয়েছে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন। দেশের বিভিন্ন শহর ও কমিউনে অনুষ্ঠিত এ ভোটকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ব্যাপক আগ্রহ। স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক জোট ও স্বতন্ত্র তালিকার প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনেও এক ডজনের বেশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী বিভিন্ন শহরে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ফ্রান্সের প্রশাসনিক কাঠামোতে মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন স্থানীয় গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এ নির্বাচনের মাধ্যমে সিটি কাউন্সিল সদস্যরা নির্বাচিত হন। পরে নির্বাচিত কাউন্সিল সদস্যরাই নিজেদের মধ্য থেকে শহরের মেয়র নির্বাচন করেন। নগর উন্নয়ন, আবাসন, পরিবেশ, শিক্ষা, সামাজিক সেবা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব থাকে এ প্রতিনিধিদের ওপর।
ফ্রান্সে মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন সাধারণত দুই ধাপে অনুষ্ঠিত হয়, যাকে বলা হয় দুই ‘ট্যুর’।
প্রথম ধাপে ভোটাররা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা নাগরিক তালিকার প্রার্থীদের ভোট দেন। কোনো দল যদি বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি পায়, তাহলে সেটি সরাসরি বিজয়ী হিসেবে বিবেচিত হয় এবং দ্বিতীয় ধাপের ভোটের প্রয়োজন হয় না।
তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো তালিকা সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না।
তখন নির্বাচন গড়ায় দ্বিতীয় ট্যুরে।
দ্বিতীয় ধাপে প্রথম ট্যুরে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোট পাওয়া দলগুলো অংশ নিতে পারে। অনেক সময় বিভিন্ন দল একে অপরের সঙ্গে সমঝোতা করে নতুন জোট গঠন করে এবং দ্বিতীয় ট্যুরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। দ্বিতীয় ট্যুরে যে দল সর্বাধিক ভোট পায়, তারা সিটি কাউন্সিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে।
এবারের নির্বাচনে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কয়েকজন প্রার্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক তালিকার অংশ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
কেউ মূলধারার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, আবার কেউ নাগরিক জোটের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
কাউন্সিলর প্রার্থী শরীফ আল মোমিন বলেন, এটি শুধু রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নয়, বরং ফরাসি সমাজে বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন। গত দুই দশকে ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটির উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি এখন অনেকেই স্থানীয় রাজনীতিতেও যুক্ত হচ্ছেন।
কমিউনিটি নেতা ও বাংলাদেশি নাগরিক পরিষদের সভাপতি আবুল খায়ের লস্কর বলেন, নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি তরুণরা এখন ফরাসি সমাজের মূলধারায় যুক্ত হচ্ছে। তারা শিক্ষা, নাগরিক অধিকার ও সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নে আরও সক্রিয়। ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফোরাম ফর দ্য ডেমোক্রেসি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান ও মানবাধিকারকর্মী মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, নতুন প্রজন্ম এখানে বড় হয়েছে এবং তারা ফরাসি সমাজের অংশ। তাই শহরের উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যার সমাধানে তাদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সংগঠন ফ্রান্স বাংলাদেশ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এফবিজেএ) মুখপাত্র ও ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ মনে করেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হলে অভিবাসী কমিউনিটির বিভিন্ন সমস্যা যেমন– আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সংহতির বিষয়গুলো স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের স্থানীয় রাজনীতিতে অভিবাসী পটভূমির নাগরিকদের অংশগ্রহণ দেশটির বহুসাংস্কৃতিক গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের অংশগ্রহণও সেই ধারার একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।















