অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি বৈধ পথে দেশটিতে প্রবেশ করতে চাওয়া বিদেশিদের ওপরও কঠোরতা বাড়াচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন উদ্যোগের আওতায় অভিবাসী ভিসা প্রদান সাময়িক স্থগিত রাখা, বিপুলসংখ্যক পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভিসা বাতিলের প্রস্তুতি এবং সরকারি সুবিধার ওপর সম্ভাব্য নির্ভরতার বিষয়টি ভিসা ও স্থায়ী বসবাসের অনুমোদনে আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বিশ্বজুড়ে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের নতুন নীতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় অভিবাসী ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় সাময়িক বিরতি দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নতুন নীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো এমন ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সীমিত করা, যাদের ভবিষ্যতে সরকারি অর্থ বা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্কিন অভিবাসন নীতি ইনস্টিটিউটের অভিবাসন নীতি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক জুলিয়া গেলাট বলেন, সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সংখ্যা কমানো এবং অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা।
অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়ায় সাময়িক বিরতি
পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিবাসী ভিসা প্রদান সাময়িক স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তটি মূলত ‘পাবলিক চার্জ’ নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ কোনো আবেদনকারী ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন কি না, সেটি মূল্যায়নের নতুন নিয়ম নিয়ে বিভিন্ন দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
আগস্টের শুরুতে এই বিরতি কার্যকর হয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তা শেষ হতে পারে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। আগস্টে যেসব আবেদনকারীর সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত ছিল, সেগুলো বাতিল করা হয়নি। এসব সাক্ষাৎকার সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে নতুন সময়সূচিতে নেওয়া হবে।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে অভিবাসী ভিসার জন্য আবেদন করা ব্যক্তিদের ওপর। এর মধ্যে মার্কিন নাগরিকদের বাবা-মা, স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান ও ভাই-বোনদের পারিবারিক ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আবেদনও রয়েছে।
তবে নিয়োগকর্তার পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা কিছু কর্মভিত্তিক অভিবাসী ভিসা এই স্থগিতাদেশের আওতায় পড়ছে না। কারণ সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীরা নিজেদের আয় দেখিয়ে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকার বিষয়টি তুলে ধরতে পারেন।
জুলিয়া গেলাট সতর্ক করেছেন, ভিসা সাক্ষাৎকারের সময় নতুন করে নির্ধারণ করা আবেদনকারীদের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে। তাঁর মতে, সাক্ষাৎকারের সময় পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন এবং নতুন তারিখের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
প্রায় দুই লাখ ভিসা বাতিলের প্রস্তুতি
অভিবাসী ভিসার পাশাপাশি পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভিসা নিয়েও কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেওয়া এসব ভিসার মধ্যে যেসব ভিসাধারী যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন বা বর্তমানে আশ্রয় চাইছেন, তাদের ভিসা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে পাওয়া নথি অনুযায়ী, প্রায় দুই লাখ বিদেশির ভিসা বাতিল করা হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একসঙ্গে সবচেয়ে বড় পরিসরে ভিসা বাতিলের ঘটনাগুলোর একটি হতে পারে। এ উদ্যোগ আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত এবং আশ্রয়ের আবেদন করা ব্যক্তিদের ওপর এর সরাসরি প্রভাব তুলনামূলক সীমিত হতে পারে বলে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা জানিয়েছেন। কারণ আশ্রয়ের আবেদন বিচারাধীন থাকলে দেশটিতে অবস্থানের বৈধতা অনেক ক্ষেত্রে ওই আবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে, আগের পর্যটন বা ব্যবসায়িক ভিসার সঙ্গে নয়।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ আবেদনকারীদেরও একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। পর্যটন বা ব্যবসায়িক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতাকে প্রশাসন কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করতে চাইছে।
সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতার বিষয়েও কড়াকড়ি
স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সরকারি সহায়তা গ্রহণের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা বিভাগের মাধ্যমে এমন একটি নিয়ম পুনরায় কার্যকর করা হয়েছে, যার আওতায় খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা সহায়তা ও আবাসন ভর্তুকির মতো সরকারি সুবিধা ব্যবহারকারী অভিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা দেওয়ার ওপর পৃথক স্থগিতাদেশ কার্যকর ছিল। আদালতের রায়ে সেই ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর নতুন উদ্যোগগুলোর আইনি পরিণতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ কথিত ভুয়া আশ্রয়ের আবেদনে বিরক্ত। তাঁর বক্তব্য, আশ্রয় ব্যবস্থাকে অভিবাসন আইন এড়িয়ে যাওয়ার পথ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
এর আগে এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছিল, কোনো আবেদনকারী নিজ দেশে ফিরে যেতে ভয় পাওয়ার কথা জানালে তাঁর ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে।





